দুর্দশাগ্রস্ত পদ্মা ব্যাংক

সরকারি প্রতিষ্ঠানের ২২০০ কোটি টাকা আমানত ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ

রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পদ্মা ব্যাংকে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় অংকের অর্থ আমানত রাখা হয়েছিল।

রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পদ্মা ব্যাংকে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় অংকের অর্থ আমানত রাখা হয়েছিল। বর্তমানে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। নজিরবিহীন ঋণ জালিয়াতি ও অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে কার্যক্রম শুরুর তিন বছরের মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়ে পদ্মা ব্যাংক। যত দিন যাচ্ছে ব্যাংকটির অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে। প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি নিয়ে পদ্মা ব্যাংক বর্তমানে দেউলিয়া হওয়ার পথে। এ অবস্থায় ব্যাংকটির কাছে গচ্ছিত বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের অর্থ ফেরতের জন্য করণীয় নির্ধারণে গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় ব্যাংকটিকে আমানতের অর্থ ফেরত দেয়ার বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ জমা দিতে বলা হয়েছে। যদিও অনিয়মে বিপর্যস্ত পদ্মা ব্যাংকের কাছ থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের অর্থ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারি যেসব প্রতিষ্ঠান পদ্মা ব্যাংকে আমানত রেখেছে তার মধ্যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টেরই রয়েছে ৮৯৯ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংকটিতে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), জীবন বীমা করপোরেশন, সাধারণ বীমা করপোরেশন, তিতাস গ্যাস, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল), ইসলামিক ফাউন্ডেশন, নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসহ সরকারি আরো বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের আমানতের অর্থ আটকে আছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে পদ্মা ব্যাংকে ৪৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের গচ্ছিত আমানতের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

পদ্মা ব্যাংকে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টসহ অন্যান্য সরকারি সংস্থার আটকে থাকা আমানতের অর্থ আদায়ের জন্য করণীয় নির্ধারণে গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেকের সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জানানো হয়েছে যে আমানতের অর্থের পরিমাণ নিয়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও পদ্মা ব্যাংকের মধ্যে যে মতপার্থক্য ছিল সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে মিটমাট করে দেয়া হয়েছে। এতে বর্তমানে পদ্মা ব্যাংকে ৪৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। কীভাবে এ আমানতের অর্থ পরিশোধ করা হবে সে বিষয়ে এরই মধ্যে পদ্মা ব্যাংক একটি রোডম্যাপ দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। তবে রোডম্যাপটি পূর্ণাঙ্গ নয়। তাই পরবর্তী সভায় পদ্মা ব্যাংককে বিস্তারিত পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ দিতে বলা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পদ্মা ব্যাংকের বর্তমানে যে অবস্থা তাতে সরকারের পক্ষ থেকে মূলধন সহায়তা দেয়া না হলে ব্যাংকটির পক্ষে আমানতের অর্থ ফেরত দেয়া সম্ভব হবে না। তাছাড়া শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, এখানে সাধারণ মানুষেরও আমানতের অর্থ আটকে রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের অর্থ আদায় করা সম্ভব না হলে সেক্ষেত্রে জনগণের অর্থও গচ্ছা যাবে। আবার সরকার যদি ব্যাংকটিকে মূলধন সহায়তা দেয় তাহলে সেটিও জনগণের অর্থ থেকেই দিতে হবে। তাই ব্যাংকটির কাছে বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ চাওয়া হয়েছে। রোডম্যাপ পাওয়ার পর পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পদ্মা ব্যাংকে আমানত হিসেবে থাকা সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অর্থ কীভাবে আদায় করা যায়, এর রোডম্যাপ কী হতে পারে তা নিয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে।

চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে ২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরু করে দি ফারমার্স ব্যাংক। ২০১৯ সালে ব্যাংকটি নাম পরিবর্তন করে হয় পদ্মা ব্যাংক। বর্তমানে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছ থেকে সংগৃহীত আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ হাজার ৬৯০ কোটি টাকাই বর্তমানে খেলাপি, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৯০ শতাংশ। এ অবস্থায় ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

তারল্য সংকট ও ক্রমাগত লোকসানের কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতাও পরিশোধ করতে পারছে না পদ্মা ব্যাংক। এজন্য ধাপে ধাপে বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদও অনেক টাকা বকেয়া পড়েছে। সারা দেশে ব্যাংকটির ৬০টি শাখা ও ১৪টি উপশাখা রয়েছে। ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ৭৭০।

পদ্মা ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্যাংকের ব্যয় কমাতে এরই মধ্যে ২০টি শাখা বন্ধ কিংবা অন্য শাখার সঙ্গে একীভূত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে গুলশান শাখার সঙ্গে গুলশান করপোরেট শাখা একীভূত করা হবে। এরই মধ্যে শাখা দুটিকে একীভূতকরণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

শুরুতে ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দীন খান আলমগীর। তবে ধারাবাহিকভাবে গ্রাহকদের আমানতের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০১৭ সালে ব্যাংকটিতে হস্তক্ষেপ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পুনর্গঠন করা হয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। ওই সময় মহিউদ্দীন খান আলমগীর ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের পদ ছাড়তে বাধ্য হন। একই সময় অপসারণ করা হয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে। এরপর আওয়ামী সরকারের আমলে দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম প্রভাবশালী মাফিয়া চৌধুরী নাফিজ সরাফাত ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে পদ্মা ব্যাংকে রূপান্তর করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে পদ্মা ব্যাংকের ৬৮ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা নিয়েছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এবং ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। বিনিময়ে এসব প্রতিষ্ঠানকে জোগান দিতে হয়েছে ৭১৫ কোটি টাকার পুঁজি। তবে তা সত্ত্বেও ব্যাংকটির দুর্দশা কাটেনি। সরকারি পুঁজি ছাড়াও ব্যাংকটিকে বাঁচাতে বিগত আওয়ামী সরকারের সময়ে বেশকিছু উদ্যোগ সামনে আনা হয়েছিল। এক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগের মাধ্যমে তারল্য সরবরাহ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকে প্রেফারেন্স শেয়ারে রূপান্তরের প্রস্তাব উঠলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি আব্দুর রউফ তালুকদার গভর্নর থাকাকালীন ২০২৪ সালের মার্চে পদ্মা ব্যাংককে বেসরকারি খাতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। যদিও গত বছরের আগস্টে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এক্সিম ব্যাংকের পর্ষদ এ একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।

পদাধিকারবলে বর্তমানে পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী খান। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দায়িত্বরত। পদ্মা ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতির নিয়ে জানতে চাইলে শওকত আলী খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ব্যাংকটির তেমন কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমানতের পাশাপাশি মূলধনও শেষ হয়ে গেছে। এখন ঋণ আদায় ছাড়া ব্যাংকটির অন্য কোনো কার্যক্রমও নেই। পর্ষদের পক্ষ থেকে আমরা বলে দিয়েছি, ঋণ থেকে যে অর্থ আদায় হবে, সেটি দিয়ে আমানত পরিশোধ করা হবে। আর ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ও কমিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’

শওকত আলী খান আরো বলেন, ‘পদ্মা ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ দেয়নি। ব্যাংকটির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত সম্পর্কেও আমরা এখনো জ্ঞাত নই। দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের স্বার্থে যেকোনো সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার বিষয়ে আমরা উদার।’

পদ্মা ব্যাংককে আপাতত কোনো তারল্য সহায়তা দেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ব্যাংক খাত সংস্কারের অংশ হিসাবে বাংলাদেশ ব্যাংক মার্জার-অ্যাকুইজিশনের পথে হাঁটছে। পদ্মা ব্যাংক অনেক আগে থেকেই দুর্বল ব্যাংক হিসাবে চিহ্নিত। এ ব্যাংকটিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মার্জারের বিবেচনায় রয়েছে। প্রথম ধাপের মার্জারের তালিকায় পদ্মা ব্যাংকের নাম নেই। দ্বিতীয় ধাপে এটি মার্জারের বিবেচনায় আসবে। ব্যাংকটিতে ইতোপূর্বে মূলধনের জোগান ও তারল্য সহায়তা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। তাই আপাতত পদ্মা ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেয়ার কোনো পরিকল্পনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেই।’

আমানতের আটকে থাকা অর্থ ফেরত দেয়ার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে দফায় দফায় পদ্মা ব্যাংকের কাছে চিঠি পাঠানো হলেও কোনো লাভ হয়নি। মূলত ব্যাংকটির মালিক পক্ষের স্বার্থ রক্ষার জন্য আওয়ামী সরকারের সময়ে লোক দেখানো উদ্যোগ নেয়া হলেও আমানতকারীদের অর্থ ফেরাতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর আটকে থাকা আমানত পদ্মা ব্যাংকের কাছ থেকে উদ্ধারে আবারো উদ্যোগ নেয়া হয়। এজন্য গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সভায় বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের আটকে থাকা আমানতের বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়। সভায় এ অর্থ নগদায়নের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে আলোচনাপূর্বক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ব্যাংকটি থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতের অর্থ উদ্ধারে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ শুরু করে।

আরও